আজ ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আওয়ামী লীগকে সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রভাষ আমিন

প্রকৃতিতে এখন চলছে প্রবল তাপপ্রবাহ। এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো উত্তাপ কিছুতেই নেই। তবে এর ফাঁকেই দেশজুড়ে চলছে উপজেলা নির্বাচনের প্রচারণা। চার ধাপের এই নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ হবে ৮ মে। এমনিতে বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই উৎসব। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন গ্রামগঞ্জে দারুণ চাঞ্চল্য আনে। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন থেকে উৎসবমুখরতা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। নির্বাচন এখন নিছক আনুষ্ঠানিকতা। বিরোধী দল না থাকায় নির্বাচনের মাঠে উত্তাপ নেই বললেই চলে। উত্তাপ না থাকলেও এই নির্বাচন নানামুখী সংকট তৈরি করেছে। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংকট তো ঘরে। তবে নির্বাচন কমিশনের সংকট বহুমুখী।

উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি অংশ নিচ্ছে না। কিন্তু দুই দলের সংকটে একটা মিল আছে। কোনো দলেই তৃণমূলের ওপর মূল দলের নিয়ন্ত্রণ নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের সিদ্ধান্ত মানছেন না। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জনের ঘোষণা দিলেও তাদের নেতাকর্মীদের অনেকেই নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়েছেন। এটা ঠিক, বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে, প্রথম দফা ভোটের মনোনয়নপত্র দাখিলের পরদিন। তাতে অনেকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করে ফেলেন। তাই বিএনপি বর্জনের ঘোষণা দিলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি। অবশ্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এরই মধ্যে ৭৩ জন প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি বিএনপির সব নির্বাচনেই অংশ নেওয়া উচিত। আন্দোলনের অংশ হিসেবেও তাদের নির্বাচনে যাওয়া উচিত। যেহেতু তারা আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকা ঠেকাতে পারছে না, তাতে নির্বাচনে না গিয়ে নিজেদেরই আরও জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। বরং নির্বাচনে অংশ নিলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আরও বাড়বে। নেতাকর্মীরা নির্বিঘ্নে মাঠে কাজ করতে পারবেন। নির্বাচন বর্জন করে একে তো নিজেরা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তার ওপর আগ্রহী নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করে দলে সংকট আরও বাড়াচ্ছে। এভাবে একের পর এক নির্বাচন বর্জন আর বহিষ্কার চলতে থাকলে বিএনপির তৃণমূল এক সময় শূন্য হয়ে যেতে পারে। দলের স্বার্থেই বিএনপির উচিত আন্দোলনের অংশ হিসেবে সব নির্বাচনে অংশ নেওয়া। তবে বিএনপি দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের বহিষ্কার করে বিএনপি মাঠপর্যায়ে একটা কঠোর বার্তা দিতে পেরেছে। ভুল হোক আর ঠিক, দলের সিদ্ধান্ত সবাইকেই মানতে হবে। সংগঠনে শৃঙ্খলাটা খুব জরুরি।

এ ক্ষেত্রে অবশ্য সরকারি দল আওয়ামী লীগ অতটা কঠোর হতে পারেনি। এই সুযোগে দলের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা। অবশ্য মন্ত্রী-এমপির স্বজনরা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, আওয়ামী লীগের এমন প্রকাশ্য ঘোষণা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বা দেউলিয়া ঘোষণা না হলে বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত না হলে যে কারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার রয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া না দেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু কাউকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার অধিকার নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে দলের পক্ষ থেকে মন্ত্রী-এমপির স্বজনদের নির্বাচনে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও অনেকেই সেটা মানেননি। আসলে আওয়ামী লীগ নিজেদের ফাঁদে নিজেরা পড়েছে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখাতে বিদ্রোহীদের জন্য মাঠ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের অনেক ডাকসাইটে নেতা, মন্ত্রী-এমপিদের হারিয়ে ৬২ জন স্বতন্ত্র সদস্য সংসদে চলে আসেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশগ্রহণমূলক দেখানোর পথেই হাঁটে আওয়ামী লীগ। সবার জন্য মাঠ উন্মুক্ত রাখতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেওয়ার বিধান থেকেও সরে আসে দলটি। এই অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় এমপিতন্ত্র আর পরিবারতন্ত্র। কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। আর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র তার কন্যা তাহসিন বাহার সূচনা। মনোনয়ন দেওয়ার বিধান থাকলে নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ এমপি কন্যাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিত না।

দেখাদেখি উপজেলা নির্বাচনেও এমপি-মন্ত্রীরা মাঠে নেমে পড়েন মাঠ দখলে রাখতে। এমনিতে এমপিদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন। তাদের আসন অনেক উঁচুতে। কিন্তু তারা সে উঁচু আসন থেকে নিজেদের নামিয়ে এনে স্থানীয় সরকারে প্রভাব বিস্তার করতে চান। রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, গম, চাল, বিধবা ভাতাÑ সবকিছুতে তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকা চাই। তাই তারা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। প্রার্থী দিতে চান নিজের পছন্দমতো। কেউ কেউ কোনো ঝুঁকিই নিতে চান না। ছেলে, বউ, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, শ্যালকÑ সুবিধামতো নিজেদের ঘরেই রাখতে চান। যেহেতু মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত। তাই সবাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এ নিয়ে এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। সব যদি এমপি-মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাই পাবেন, তা হলে বাকিরা আওয়ামী লীগ করবে কেন।

তাও সবকিছু চলছিল ঠিকঠাক। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের শ্যালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে চেয়ে লেজেগোবরে করে ফেলেন। একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায় সিদ্ধান্ত আসে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। কিন্তু অনেকেই সেটা মানেননি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের ছেলেও নির্বাচনী মাঠে আছেন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডির কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। কিন্তু ছেলেকে সরিয়ে আনেননি শাজাহান খান। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যই যদি দলের সিদ্ধান্ত না মানেন, বাকিরা মানবেন কেন। নির্বাচনের মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দলের মাঠপর্যায়ে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা কীভাবে সামাল দেবে আওয়ামী লীগ সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানেন, নির্বাচনের আগে যত ধমক-ধামক দেওয়া হোক; নির্বাচনের পর কারোরই কিছুই হবে না। জিতে আসতে পারলে তো বটেই, না জিতলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগেই থাকতে পারবেন তারা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম দুবার বহিষ্কার হয়ে দুবারই দলে ফিরেছেন। তাই কেউ আর দলের সিদ্ধান্তকে পাত্তা দেন না।

তবে আওয়ামী লীগের এই কোন্দল চিন্তায় ফেলেছে নির্বাচন কমিশনকে। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব বিস্তার ঠেকানো ও আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠের কর্মকর্তারা। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে উঠে আসে এই চ্যালেঞ্জের কথা। আত্মীয়স্বজন থাকুক, মন্ত্রী-এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করবেন। তাতে মাঠে উত্তাপ ছড়াবে। অবনতি হতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। বিএনপি না থাকায় নির্বাচনে এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের লড়াই। কিন্তু এই ঘর-ঘরকা লড়াইই বিপদে ফেলতে পারে নির্বাচন কমিশনকে। তাই তাদের সামনে এখন আওয়ামী লীগকে সামলানোর চ্যালেঞ্জ।

প্রভাষ আমিন : বার্তাপ্রধান এটিএন নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর