আজ ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

দাবদাহে বাংলাদেশ কি সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে?

ইকবাল হাবিব

বাংলাদেশে বর্তমানে যে উচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে তা নতুন নয়। ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল। ঢাকার ক্ষেত্রে, স্বাধীনতার আগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল, ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মূলত নগরের এই দাবদাহ আসলে অনুভবের বিষয়। বর্তমানে নগরীগুলোয় তাপমাত্রা অনুভবের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধির চেয়ে অনুভবের (ফিলস লাইক) মাত্রা বেড়েছে। কারণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশের সাথে সহনশীল সহমর্মিতায় সহাবস্থানের মানসিকতার প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণও তীব্রভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি, ধনী-দরিদ্র বা সামর্থ্যবান-অল্প সামর্থ্যবানদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের তীব্রতার প্রতিফলনই হচ্ছে এই অনুভবের প্রখরতা বৃদ্ধি। ফলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, আর প্রকারান্তরে এভাবেই অর্ধবিকলাঙ্গ একটি প্রজন্ম তৈরির যন্ত্রে পরিণত হয়েছে আমাদের নগর ও নগরায়ণ।

দেশের নগরীগুলোয় দাবদাহ অনুভবের এই তীব্রতা বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ হলো ভুল নগর দর্শন (Urbanism)। নব্বই দশকের পর নগরীগুলোয় অপরিকল্পিত, মানব বিচ্ছিন্ন এবং পরিবেশ বৈরী কর্মধারার মধ্য দিয়ে দ্রুতগতির নগরায়ণের ধারার যে বিকাশ, আজকের এই নগরীগুলোর অভিঘাতসমূহ তারই প্রকাশ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর উষ্ণতম বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে ২০২৪ সাল। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংক্রান্ত বার্ষিক রিপোর্টে এক দশকে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বরাবরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির তালিকায় অন্যতম।

পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘এল নিনো (El Nino)’র প্রভাব, বাংলাদেশে চরমভাবাপন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়ার সৃষ্টি করছে এবং এর ফলে ষড়ঋতুর এই দেশে ঋতু পরিবর্তনে অসঙ্গতি দেখা দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, দক্ষিণ দিকে থেকে আগত মৌসুমী বায়ুর দ্রুত আগমন ঘটছে আবার অপরদিকে উত্তর দিক থেকে আগত আন্তঃদেশীয় দূষিত ও উষ্ণ বায়ুর প্রবেশ ঘটছে দেশীয় আবহাওয়ায়।

এছাড়া নদীর উপর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদী শাসন ও খনন ব্যবস্থাপনার অভাবে নদীমাতৃক এই দেশের নদীগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। এভাবে উত্তপ্ততার পরিধি বাড়ছে, তাপের মাত্রা সীমাহীন না হলেও তীব্র দাবদাহ অনুভূত হচ্ছে।

সবুজায়ন ও বনায়ন প্রেক্ষিত
বাংলাদেশে বনজ সম্পদ ও বনভূমির অবক্ষয় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশে ভূখণ্ডের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের বন বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব মতে বাংলাদেশে বার্ষিক ২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বন উজাড় হয়েছে যা বার্ষিক বৈশ্বিক গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ। সতেরো বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬ বর্গকিলোমিটার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট ধ্বংস করা হয়েছে। ‘রাইজিং টাইডস, রোরিং ফিউচার্স: দ্য সুন্দরবনস কোয়েস্ট ফর সারভাইভাল-২০২৪’ (Rising Tides, Roaring Futures: The Sundarbans’ Quest for Survival) শীর্ষক গবেষণা মতে, ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ দশকে সুন্দরবনের ঘন বনাঞ্চল ২৭ ভাগ কমেছে।

পাশাপাশি দেশের নগরগুলোসহ বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে বৃক্ষশোভিত সড়কসমূহের আচ্ছাদনকে দ্রুততম সময়ে বৃক্ষহীন মরুকরণ যাত্রায় মরণমুখী চেষ্টাও বিগত দিনগুলোয় দৃশ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের কথা উল্লেখযোগ্য। সম্প্রসারণের নামে এই সড়কটির দুই পাশের সবুজ আচ্ছাদন বা গাছগুলো কেটে ফেলার পাশাপাশি পরবর্তীতে আরও উন্নয়নের নামে সড়ক বিভাজকের গাছগুলোও কেটে ফেলা হয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর উষ্ণতম বছরের রেকর্ড ভাঙতে পারে ২০২৪ সাল। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংক্রান্ত বার্ষিক রিপোর্টে এক দশকে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বরাবরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির তালিকায় অন্যতম।

এক্ষেত্রে স্পষ্ট করা দরকার যে, সবুজ আচ্ছাদন তৈরি এবং ছায়াপ্রদায়ী গাছ দ্বারা সবুজায়ন এক বিষয় নয়। নব্বই শতকের প্রায় ৩৬ শতাংশ বৃক্ষশোভিত এই মহানগরীতে বর্তমানে উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় গাছ রয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ (ইউএসএইড জরিপ, ২০২২) এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০ শতাংশেরও কম। অথচ একটি নগরে জনজীবনের জন্য ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সবুজায়ন জরুরি।

দেশের নগরীগুলোয় বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রদানকারী ও বায়ুমণ্ডলে মানুষের বসবাস স্তরে ছায়াঘেরা ৫ থেকে ৬ গুণ শীতল পরিবেশ বা মাইক্রো ক্লাইমেটে বজায় রাখার সবুজ বৃক্ষরাজির আবরণকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। এভাবে দেশের শহরসমূহে বৃক্ষরাজি বা ‘গ্রিন/সবুজ নেটওয়ার্ক’ বিলুপ্তকরণ প্রক্রিয়া চলমান এবং বিদ্যমান পার্ক ও খেলার মাঠসহ খোলা জায়গাগুলো কংক্রিট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য যে, অব্যাহত দাবদাহের মধ্যেই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাঁধবাজার থেকে মাদুলিয়া পর্যন্ত রাস্তার পাশের ৩ হাজার গাছ কাটার পরিকল্পনা করছে বন বিভাগ এবং চলতি বছরেই ইতিমধ্যে ওই সড়কের লাহিনীপাড়া থেকে বাঁধবাজার পর্যন্ত প্রায় ৩ কিমি সড়কে প্রায় ৩ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।

ছায়াদানকারী বৃক্ষগুলো ব্যক্তি পর্যায়েও মরণমুখী প্রবণতার মধ্যে রয়েছে কারণ ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো জমিতেই এক ইঞ্চি জায়গাও পাকা ছাড়া অর্থাৎ ভেদযোগ্য না রাখার প্রবণতা সর্বগ্রাসী। প্লটগুলোয় গাছ ও উঠানসমৃদ্ধ বাড়ি নির্মাণের চিরায়ত ধারাকে আমূল পরিবর্তন করে পুরো জায়গা জুড়ে ভবন নির্মাণ, সর্বোপরি, ভবনগুলোয় বিদ্যমান আঙিনায়, বারান্দায় বা ছাদে গাছ সমৃদ্ধ ও ভূমি আচ্ছাদন (ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ)-এর তোয়াক্কা না করে প্রকৃতি নির্ভর স্থাপত্য চর্চার বিপরীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রনির্ভর সর্বোচ্চ ঘনবিন্যস্ত একতলা, দোতলা বা বহুতল ভবন নির্মাণের সংস্কৃতি এই নগরীকে করেছে আরও বিবর্ণ। উল্লেখ্য যে, ১০ কাঠা জমিতে যতগুলো গাছ রোপণ করা যায়, শুধুমাত্র সৃষ্টিশীলতা এবং সংবেদনশীলতার ছোঁয়ায় তার চেয়ে তিনগুণ বেশি বৃক্ষ এই জমিতে স্থাপিত ভবনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব।

এই সংকট মোকাবিলায় করণীয় হচ্ছে, বন ও বনভূমি সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/অধিদপ্তর/কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ, প্রণোদনা ও আইন ভঙ্গকারীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা। একইসাথে সিটি কর্পোরেশন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে পথভ্রষ্ট ‘সম্প্রসারণ উন্নয়ন’-এর নামে বসবাসযোগ্য নগর পরিবেশ ধ্বংসে যেভাবে সচেষ্ট, তা থেকে তাদের সম্পূর্ণ নিবৃত করে কার্যকর ‘সবুজায়ন নীতিমালা’র ভিত্তিতে সংরক্ষণ নিশ্চিত করে ভারসাম্যপূর্ণ এবং দেশজ বৃক্ষরোপণ ও লালনের কর্মসূচি কার্যকর করার পাশাপাশি ‘নগর বন’ সৃষ্টির ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তি ও কর্পোরেট ভিত্তিক সবুজায়ন ও বনায়ন উদ্যোগকে প্রণোদিত ও কখনো কখনো বিশেষভাবে উৎসাহিত করার প্রয়াস নিতে হবে।

সংকটাপন্ন জলাশয় ও জলাধার
সরকারি পর্যায়ে এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট জলাশয়, খাল, পুকুরসহ অন্যান্য জলাধার সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না করে বরং দখলদারদের কাছে জিম্মি হওয়ার একটি মনোবৃত্তি প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। নগরীর বৃক্ষরাজির পাশাপাশি জলাশয়-জলধারা (ব্লু/নীল নেটওয়ার্ক)-কে ক্রমাগত বিলুপ্ত হতে দেওয়া এবং এর ‘রক্ষণ ও সংরক্ষণ’ (কনজারভেশন ও প্রিজারভেশন)-এই দুটো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্য মূলক এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত না করাই এর মূল দায়।

জলাশয়গুলো তার উপরিতলে সূর্যের প্রতিফলনের কারণে জলীয়বাষ্প উদ্গিরণের ‘প্রকৃতিদত্ত যন্ত্র’-এর ন্যায় কাজ করে। সূর্যের বিকিরণে জলীয়বাষ্প সম্বলিত বায়ুস্তর তৈরির মাধ্যমে পরিবেশের দূষণকারী কণিকাসমূহের এই জলীয়বাষ্পের সংস্পর্শে এসে মাটিতে নিষ্পত্তি হয়। সেই সঙ্গে জলীয়বাষ্পে বায়ুর উষ্ণায়নের মধ্যে সঞ্চারণের বিপরীতে শীতলীকরণের চলমান প্রক্রিয়ায় বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু নগরীর খাল, জলাধার, পুকুর, জলাভূমিকে ভূমির অতি পুঁজিভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কারণে এইসব প্রকৃতিপ্রদত্ত ঐশ্বর্য ও সম্পদকে আমরা আগ্রাসী মনোভাবে ধ্বংস করছি এবং প্রকৃতিগত বায়ুপ্রবাহের প্রক্রিয়াকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর ল্যান্ডসেট স্যাটেলাইট বিশ্লেষণী গবেষণা বলছে, ২৮ বছরে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা থেকেই প্রায় ৮৫ ভাগ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি এই সময়ে নির্মাণ এলাকা বা স্থাপনা বেড়েছে ৭৫ ভাগ অর্থাৎ সবুজ গাছপালা এবং জলাশয় ধ্বংস করে কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে ‘নীল এবং সবুজ নেটওয়ার্কের’ মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই মহানগরীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে।

অতএব করণীয় দাঁড়াচ্ছে এই যে, নগরব্যাপী বিদ্যমান পুকুর, খাল এবং অন্যান্য জলাশয় পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণপূর্বক নগরীর বাসযোগ্যতা উন্নয়নে সমন্বিতভাবে ‘ব্লু’ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি নদীর সাথে তাদের সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজনীয় আশু উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি, নগরীতে বিদ্যমান পুকুর, জলাধার ও জল সংরক্ষণ উদ্যোগগুলোর ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বৈষম্যের তীব্রতা ও তার বহিঃপ্রকাশ
ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পুঁজি প্রদর্শন মানসিকতা পাশাপাশি বিদেশভাবাপন্ন মনোভাব তথা অনুকরণপ্রিয়তার মাধ্যমে ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ’ এই অবস্থা সৃষ্টিতে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উদ্ভূত দাবদাহ সমস্যা থেকে একটি বিশেষ সামর্থ্যবান গোষ্ঠীর নিজেদের অবমুক্ত রাখার যে নগর মানসিকতা তৈরি, তারই ফলস্বরূপ যথেচ্ছভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নির্ভরতার মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদার উপর প্রচণ্ড চাপও তৈরি করে চলেছে।

ফলে, অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় বজায় রাখার স্বার্থে ‘অতিরিক্ত তাপমাত্রা’ প্রতিবেশে ছড়িয়ে দেওয়ার অবিরত অন্যায় কার্যক্রম চলছে। পরিণামস্বরূপ, প্রতিবেশী হিসেবে বসবাসরত অসামর্থ্যবান বিশাল জনগোষ্ঠীর দিকে প্রায় ৬ থেকে ১০ ডিগ্রি অতিরিক্ত তাপ বহমান হওয়ার কারণে ‘উত্তপ্ততার অনুভব’ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সমাজের বিত্তশালী সামর্থ্যবান আর সাধারণের মধ্যে দূরত্ব এবং অসমতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, দাবদাহের তীব্রতার অনুভবের পার্থক্যও তাই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে।

ঢাকার বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও ওজোন—এই পাঁচ ধরনের গ্যাস জমা হচ্ছে। যার কারণে নগরীর মাটি ও বাতাস আরও উত্তপ্ত হচ্ছে এবং তীব্র অস্বস্তিকর তাপ অনুভূত হচ্ছে।

এই দেশের ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত প্রেক্ষাপটে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে, গুরুত্বের সঙ্গে প্রকৃতি নির্ভরতায় ও আলো বাতাসের প্রবাহধারা নিশ্চিতে বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কেননা চাকচিক্যময় কাঁচের দেয়াল ঘেরা ভবন তৈরির মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র দাবদাহ আর নগর তাপীয় সংস্কৃতিকেই উত্তপ্ত করা হচ্ছে না, বরং জ্বালানি চাহিদার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি নগরবাসীকে দুর্ঘটনার অভিঘাতের ভয়ংকর রকম পরিণতি দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এটিও উপলব্ধি যে, নগর জলাধারের অনুপস্থিতিতে এই ধরনের অগ্নি নিবারণ সম্ভবপর হতো না এবং কাঁচবদ্ধ ভবনে ধোঁয়ার কারণেই এত মানুষের মৃত্যু এড়ানো যায়নি।

তাই করণীয় হিসেবে, এই ক্ষেত্রে সমীক্ষা নির্ভর নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রণোদনা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাম্যতার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর দর্শন নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও সংস্থাগুলো নিয়ে আশু উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তি পর্যায়ে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং জনমানুষকে নিয়ে প্রতিটি বাড়িতে দাবদাহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সামর্থ্যের জায়গাটি কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সঠিক বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বিধায় এই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

একইসাথে, যত্রতত্র নিয়ন্ত্রিত কাচের ভবনের আত্মঘাতী সংস্কৃতির বিপরীতে প্রকৃতির নির্ভরতায় জীবন আচরণ নিশ্চিতের ‘নগর দর্শন’ ভিত্তিক বিনির্মাণ নিশ্চিতে অনতিবিলম্বে ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’য় যথোপযুক্ত শুদ্ধিকরণের উদ্যোগ প্রয়োজন। যদিও রাজউক তাড়াহুড়া করে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এবং অংশীজনদের সাথে পরামর্শ গ্রহণ ব্যতিরেকে পাশ কাটানোর চেষ্টা মাধ্যমে সেই সুযোগকেও হত্যা করার চেষ্টা করছে। আশু উদ্যোগের মাধ্যমে তা প্রতিহত ও যথাযথ করা প্রয়োজন।

বায়ুপ্রবাহ এবং দূষণজনিত প্রেক্ষাপট
দেশের নগরীগুলোয় ভবনগুলোর বিন্যস্ততায় পারস্পরিক দূরত্ব বা সেটব্যাকের মধ্য দিয়ে বাতাসের প্রবাহধারা নিশ্চিত করার যে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা ছিল তা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা যায়নি বললে অত্যুক্তি হবে না। ঢাকার ক্ষেত্রে, বিভিন্ন সময়ে ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’র অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তন কিংবা তার ব্যত্যয় করে অননুমোদিত ভবন নির্মাণ তথা অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন কার্যক্রম প্রকারান্তরে অবস্থাকে আরও দুর্বিষহ করেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ঢাকা মহানগরীতে অনুমোদনহীন ভবনের সংখ্যাই ৯৪ শতাংশেরও বেশি, এর মধ্যে অনুমোদন নেওয়ার পর ব্যত্যয়কারী বা পুরোপুরি আইন লঙ্ঘনকারীরাও রয়েছে। ফলে, বাতাসের আনুভূমিক চলাচল সড়ক করিডোরের বাইরে নেই বললেই চলে। এভাবে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য নগরীগুলোয় বিভিন্ন এলাকাসমূহ উত্তপ্ত দ্বীপের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তাপীয় দ্বীপ বা ‘হিট আইল্যান্ড’-এ রূপান্তরিত হয়েছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জার্মান রেড ক্রস এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণায় ঢাকার বাড্ডা, গুলশান, মহাখালী, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, গাবতলী, বাসাবো, বাবুবাজার, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, উত্তরা, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, ফার্মগেটসহ ২৫টি স্থানকে ‘তপ্ত দ্বীপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

অপরদিকে, দেশের নগরীগুলোয় দুইভাবে বায়ু দূষিত হচ্ছে—এক, কণিকা (পার্টিকেল) দূষণ এবং দুই, গ্যাসীয় দূষণ। এই দুই দূষণের কারণে বায়ুমণ্ডলের বসবাসযোগ্য সর্বনিম্ন স্তরে কণিকার ঘনত্ব অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকা বা কংক্রিটের এই নগর ব্যবস্থায় দূষণের কারণে সৃষ্ট অধিক ঘনত্বের এই কণিকা সূর্যের বিচ্ছুরণকৃত তাপ ধারণ করে তাকে এই স্তরে অবরুদ্ধ করে ফেলছে, ফলে এই স্তরের তাপবোধ অতিরিক্ত ও অসহনীয় হয়ে উঠার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সূর্যের তাপ দীর্ঘ সময় জুড়ে কংক্রিট ও সড়কে প্রতিফলিত হয়ে বায়ুকণিকা দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বসবাসযোগ্য নিম্ন স্তরের তাপমাত্রায় তীব্রতা তৈরি করছে।

সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে ময়লার ভাগাড়, ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া থেকে ঢাকার বাতাসে পাঁচ ধরনের ক্ষতিকর গ্যাসের স্তর তৈরি হয়েছে। ঢাকার বাতাসে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও ওজোন—এই পাঁচ ধরনের গ্যাস জমা হচ্ছে যার কারণে নগরীর মাটি ও বাতাস আরও উত্তপ্ত হচ্ছে এবং তীব্র অস্বস্তিকর তাপ অনুভূত হচ্ছে।

অতএব করণীয় দাঁড়াচ্ছে, নগরীতে বায়ু ও গ্যাসীয় দূষণের প্রধান প্রধান নিয়ামকসমূহ যেমন, অনুপযোগী যানবাহন চলাচল, নির্মাণ কার্যক্রম ও মালামালের পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণ জনিত দূষণ, ইটভাটাজনিত দূষণ, ময়লার ভাগাড়, কারখানার নির্গত ধোঁয়াসহ অন্যান্য বায়ু দূষণকারী কার্যক্রম রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কার্যকরী ও দৃষ্টান্তমূলক দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ।

সরকারি-বেসরকারি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান দ্বারা গৃহীত প্রকল্পের আওতায় নগর বায়ু ও বর্জ্য দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার অভিঘাতের বিরুদ্ধে অভিযোজন ও ভারসাম্য নিশ্চিতের কর্মসূচিগুলো সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিতকরণের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করে তোলা জরুরী বিবেচনায় অন্যতম দাবি।

পরিশেষে, সামগ্রিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে পরিবেশবাদী, পেশাজীবীসহ সবার সম্মিলিত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টায় ২০২৩ সালে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি সবুজায়ন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। ইউএসএইড, বন অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো মিলে বৃক্ষশুমারি করেছে। সেই আলোকে দেশব্যাপী সুপরিকল্পিত নগর সবুজায়ন নীতিমালা ভিত্তিক বাস্তবায়ন কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করাই সমীচীন।

ইকবাল হাবিব ।। স্থপতি ও নগরবিদ; সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর